Dubai to Fujairah in Search of Petroglyphs
প্রাচীন প্রস্তরচিত্রের খোঁজে ফুজেইরা
এমিরেট্স দেশটা খুব ছোটো এক মধ্যপ্রাচ্যীয় মরু দেশ। ছোট হলেও পৃথিবীর মানচিত্রে এই দেশ পরিচিত কিছু বিশ্ব বিখ্যাত আধুনিক স্থাপত্যের জন্য।সারা বছর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্রমনবিলাসিরা আসেন এই দেশের বিলাসিতার আনন্দ নিতে। কিন্তু খুব কম লোকই আসেন এই দেশের প্রাচীন ইতিহাসের খোঁজে।তাই এবার ঠিক করলাম ম ফুজেইরা যাব,এমিরেটস্ এর প্রাচীন ইতিহাস খুঁজতে ।
অনেকদিন হলো চাকরিসুত্রে দুবাইতে বসবাস করছি।এর আগেও অনেকবার ফুজেইরা এসেছি ।দুবাই থেকে ফুজেইরার দুরত্ব একশো তেইশ কিলোমিটার ।নিজে ড্রাইভ করে গেলে প্রায় দেড় ঘন্টা লাগে। রাস্তা খুব ভালো।আমাদের প্রথম গন্ত্যব্য আল হায়াল ফোর্ট। দুবাই থেকে ফুজেইরা শহরে ঢোকার সময় লাইম স্টোনের ছোটো ছোটো পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তা দিয়ে যেতে বেশ ভালো লাগে।সমুদ্রের ধারে অবস্থিত হাওয়ার কারনে হয়তো এখানে চুনাপাথরের পাহাড়ের আধিক্য দেখা যায়। আরেক ধরনের পাহাড় আছে যেখানে Gabbro rock পাওয়া যায়। এই ধরনের পাথরে তামার খনিজ বেশী থাকে।
আমরা যখন আল হায়াল ফোর্টে পৌঁছলাম তখন রোদের তেজ একটু কমে এসেছে।হায়াল ফোর্টে যাওয়ার রাস্তাটা ভীষন নির্জন । তবে ভয়ের কারন নেই।অনেক নাম না জানা নীল রঙের পাখী কিছু ইনডিয়ান সিলভার বিল আর কয়েকটা পাহাড়ি আরবী গাধা চোখে পড়ল যাওয়ার পথে।এখানে বৃষ্টির জল জমে ছোটো একটা হায়াল ড্যামও তৈরী হয়েছে। এখানকার পাহাড়ী এলাকার নাম Al Hajar mountain । হায়াল ফোর্ট খুব ছোটো দেড়শো বছরের পুরোনো একটা দোতলা বাড়ি। স্থানীয় শাসকরা একসময় এখানে থাকত। চারপাশে কিছু খেজুরের বাগিচা। আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য হায়াল ফোর্ট দেখা নয়। গুগুল মামা বলেছিল এখানেই লুকিয়ে আছে ব্রোঞ্জ যুগের কিছু প্রস্তরচিত্র বা রক আর্ট।কিন্তু এতো পাথরের মাঝে রক আর্ট খোঁজা সহজ নয়। আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো ওখানে কাজ করে এক কেয়ারটেকার। কেয়ারটেকারই দেখিয়ে দিল কাছেই রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা পাথর,ইতিহাসের ভাষায় যাকে বলে Petroglyph ।আরো অনেক পেট্রোগ্লিফ ছড়ানো ছিটানো ছিল। আরকিওলজিক্যল ডিপার্টমেন্ট থেকে সব খুঁজে নিয়ে সংরক্ষন করা হয়েছে। অনেক রক আর্ট রাস্তা তৈরীর সময় নষ্ট হয়ে গেছে।রাস্তার ধারে যেটা পড়েছিল সেটা একটা হিউম্যনয়েড পেট্রোগ্লিফ।মানুষের মতো আকৃতি কিন্তু পায়ের আঙুল তিনটে।একটু অদ্ভুত মনে হলো।ব্রোঞ্জ যুগের মানুষেরা কি এইরকম দেখতে ছিল? নাকি কোনো এলিয়েনের ছবি এঁকেছে।মধ্যপ্রদেশের চারমারাতেও নাকি এইরকম অদ্ভুত মানুষের মতো দেখতে প্রাচীন রক আর্ট পাওয়া গেছে যা দেখলে সহজেই এলিয়েন মনে হয়। যদিও পাথরের উপর ছবিটা অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে এসেছে তবুও অবাক লাগছিল এটা ভেবে যে সেই ব্রোঞ্জ যুগ থেকে এটা এখোনো অবিকৃত আছে। আর্কিওলজিস্টদের ধারনা এগুলো আঁকা হয়েছিল কোনো খনিজ পদার্থ বা ভেষজ রঙ প্রানীর হাড়ের গুঁড়ো ব্যবহার করে।



Rock art in Al Hayal 
Al Hayal Fort
আল হায়ালের রক আর্ট দেখে আমরা যখন হটেলে ফিরলাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে । ফেরার পথে Madhab park গিয়েছিলাম ব্রোঞ্জ যুগের copper smelting site দেখার জন্য। পার্ক বন্ধ ছিল বলে আমরা ফিরে এলাম। ফুজেইরা তে থাকার জন্য সিটি টাওয়ার হটেল টা খুব খারাপ নয় । হটেলের পাশেই সাহরাজাদ রেস্টুরেন্ট । এখানকার চেলো কাবাব আমাদের খুব পছন্দ। এটাই আমাদের রাতের ডিনার।
পরেরদিন সকালে আমরা চললাম ওয়াদি সাহাম। শহর থেকে খুব বেশী দূর নয়। গুগুল মামা থাকলে অজানা পথ চেনা অনেক সহজ। ওয়াদি সাহাম আর্কিওলজিকাল সাইট পৌছে দেখলাম সেখানেও একটাই পেট্রোগ্লিফ রয়েছে। খুব কাছে গিয়ে দেখলাম কিছু zoomorphic কিছু Abstract আঁকা। একটা ঘোড়ায় চড়া মানুষের ছবি আর একটা সাপের ছবিও পেলাম। কিছুদিন আগে Sharuq al Hadid museum এ গিয়ে দেখেছিলাম এখানে আয়রন যুগের কিছু মাটীর পাত্র রাখা আছে যেগুলো এই অন্চল থেকে পাওয়া গেছে। পাত্র গুলোতে সাপের আকৃতি বানানো আছে। আর্কিওলজিস্ট Anne Benoist এর গবেষণায় পাওয়া গেছে যে আয়রন যুগে এখানকার লোকেরা Snake Cult এর পূজো করত। এই পাত্র গুলো সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতো। পাত্র ছাড়াও অনেক সাপের আয়রন ফিগারও পাওয়া গেছে। এমনকি Qusais অন্চলে আয়ন যুগের Snake Cult এর মন্দিরের ধংসাবশেষও পাওয়া গেছে। সাহামের রক আর্টে সাপের ছবি দেখে তাই মনে হলো যে ব্রোঞ্জ যুগ এবং আয়রন যুগে এখানকার মানুষের জীবনে সাপের একটা বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব ছিল। কোথাও যেন প্রাচীন এই মানুষগুলোর সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের একটা যোগ ছিল বলে মনে হলো। কারন এখানে এখনো সাপের পূজো হয় এবং সাপকে জ্ঞান ও উন্নতির প্রতীক মানা হয়। শুধু তাই নয় মিশর দক্ষিন আমেরিকা অস্টেলিয়া এই সব দেশেও প্রাচীন কালে সাপ মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগের সাথে যুক্ত ছিল।

Rock art in Wadi Saham 
Snake in rock art 
Snake decorated pot 


আল হায়াল এবং ওয়াদি সাহাম ছাড়াও ফুজেইরাতে ত্রিশেরও বেশী পেট্রোগ্লিফ সাইট ছডিয়ে আছে। সময়ের অভাবে সব দেখা সম্ভব হলো না। হয়তো আবার আসব।ফুজেইরা তে আসলে এমিরেট্স এর প্রাচীন ইতিহাসের খুঁজে দেখার একটা সুযোগ পাওয়া যায়।যারা পেট্রোগ্লিফ সম্পর্কে আরও বেশী খোঁজ নিতে চান তাদের জন্ন্ন নিচের দেওয়া সাইট কাজে লাগতে পারে।
http://www.onlinelibrary.wiley .com
যদি আমার লেখা পড়ে ভালো লাগে অবশ্যই একবার ফুজেইরা ঘুরে আসতে পারেন। একটু অন্যরকম লাগবে।
মাসাই মারা (শেষ পর্ব)
পরের দিন ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়ার কথা ছিলো ,প্রথমে নাকুরু লেক হয়ে তারপর নাইভাসা লেক দেখে প্যানারি রিসোর্টে ফেরা ।কিন্তু আমাদের এক সঙ্গী পরিবারের বাচ্চার একটু শরীর খারাপ থাকার জন্য ভোরবেলা বেরোনো গেলো না ।বেরোতে একটু দেরি হলো বলে ড্রাইভার আর নাকুরু লেক যেতে চাইলো না ।নাকুরু লেক মূলতঃ ফ্লেমিংগো আর দুই শৃঙ্গী গণ্ডারের জন্য বিখ্যাত । তাছাড়াও সিংহ হরিন জিরাফ হাতি সবই দেখতে পাওয়া যায় । কেনিয়া এসে গন্ডার না দেখেই ফিরে যেতে হবে শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো ।অবশেষে আমরা যখন লেক নাইভাসা পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে দশটা বাজে । লেকে বোটিংএর ব্যবস্থা ছিল। লেকটি বেশ বড় । কিছুটা চিল্কা লেকের কথা মনে করিয়ে দিল। তবে এটা মিষ্টি জলের লেক। লেকের প্রধান আকর্ষণ জলহস্তী। প্রচুর জলহস্তী লেকে ভেসে বেড়াচ্ছে । আর আছে পাখিদের বিশাল রাজ্য । মারাব্যু স্টর্ক, পেলিকান, আাইবিস,করমরান্ট, ঈগল আরও অনক প্রজাতির পাখীর দেখা পেলাম । চীনের গুইলিন শহরে গিয়ে দেখেছিলাম জেলেরা কিভাবে করমরান্ট পাখিকে মাছ ধরার কাজে লাগাচ্ছে । কিন্তু এখানে এতো করমরান্ট থাকা সত্বেও কেনিয়ান জেলেরা এই পদ্ধতিটা চাইনীজদের কাছে শিখতে পারেনি ।
নাইভাসা লেকে জলহস্তীদের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে বোটিং করতে বেশ মজা লাগছিল ।লেকের ঠান্ডা হওয়া, নরম রোদের সুড়সুড়ি গায়ে মেখে এই আদিম প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার যে কি আনন্দ তা বলে বোঝানো যাবে না ।মন বলছিল এই ভেসে থাকা যেন শেষ না হয় আর ঘড়ি বলছিলো এবার ফেরার পালা।ফেরার আগে নাইভসা লেকের ধারে সিম্বা লজে মধ্যাহ্ণ ভোজের ব্যবস্থা ছিল।ভেবেছিলাম কেনিয়া এসে এখানকার জনপ্রিয় নাইমা চোমা আর কেনিয়ান পিলাও খাবো।কিন্তু সিম্বা লজে কোনো কেনিয়ান খাবার পেলাম না ।এবার আমাদের গন্তব্য নায়াহুরুহুরু শহরের প্যানারি রিসোর্ট । অনেকটা পথ । কিন্তু পথের কোনো ক্লান্তি নেই ।খুবই সুন্দর রাস্তা ।চারিদিকে শুধু সবুজ তৃণভূমি আর কিছু চাষবাসের ক্ষেত।ছোটো বড়ো গ্রাম শহর কিছুই চোখে পড়লো না।ইতি উতি কয়েকটা ঘরবাড়ি আর ছোট দোকান।
নাইভাসা থেকে নয়াহুরুহুরু যেতে গেলে নিরক্ষরেখা পার হতে হয়। এতদিন ভূগোলে পড়েছিলাম পৃথিবীর উত্তর আর দক্ষিণ গোলার্ধ কে ভাগ করেছে এই নিরক্ষরেখা ।এবার সেই রেখার উপর যখন দাঁড়ালাম তখন ভাবলাম ভূগোলটা এতই সোজা আগে যদি কেনিয়া আসতাম ভূগোল পরীক্ষায় তাহলে এত কম নম্বর পেতাম না ।নিরক্ষরেখার দুইপাশে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র কেমন কাজ করে সেটাও তাড়াতাড়ি বুঝে যেতাম ।কত সহজে জলের ঘূর্ণির মধ্যে দেশলাই কাঠি ফেলে একজন আমাদের সেটা বুঝিয়ে দিলো ।
নিরক্ষরেখা পার করে অবশেষে আমরা যখন প্যানারি রিসোর্টে পৌঁছলাম তখন বিকেল পাঁচটা ।
রিসোর্টের পাশে থমসন জলপ্রপাত । জায়গাটা পুরো সবুজ । পাশেই একটা ছোট্ট গ্রাম । গ্রামের একটা ছোট্ট পুকুরে তাতেও জলহস্তীর বাসা । অনেক হাতিও আছে । সারা কেনিয়া জুড়েই মনে হয় প্রকৃতি বন্যপ্রাণি আর মানুষের সুস্থ্য সহাবস্থান ।এটাই তো কাম্য । থমসন জলপ্রপাতের কাছেই একটা ছোট্ট বাজার যেখানে এবোনি কাঠের তৈরী অনেক হস্তশিল্প বিক্রি হচ্ছে । একটু দরদাম করে নিতে হবে । কেনিয়ার আদিবাসীদের তৈরী হস্তশিল্পগুলি অসাধারণ । একটা না কিনে কখনোই ফিরে আসা উচিত নয় । থমসন প্রপাত দেখে গ্রামের হিপ্পো পুল ঘুরে কেনাকাটা করে যখন রিসোর্টে এলাম তখন খুব ক্লান্ত লাগছে । রিসোর্টের ব্যালকনি তে বসে এক কাপ কেনিয়ান চাএ চুমুক দিতে দিতে মনটা ভারী হয়ে এলো । কাল ফেরার পালা । এই চারদিন প্রকৃতি জঙ্গল আর নীরবতার এর সঙ্গে কখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম যে কংক্রিটের জঙ্গলে ফিরতে আর মন চাইছিলো না । তবুও ফিরতে হবে ।পরেরদিন দুপুর একটায় ফ্লাইট ।
“ফেরার পথে….
হওয়া পেলাম অনেক…যেখানে গাছ বেশি
ছাওয়া নিলাম ,কায়িক মেঘের পাশাপাশি
ফেরার পথে….
ঠাঁই পেল কিছু ক্ষুধার্ত শরীর আনন্দে
মুগ্ধপ্রায় সকল জীব প্রকৃতির এরূপ গন্ধে
ফেরার পথে….
ফিরি আমি ফিরে আরো অনেকে
ফিরছি কোথায় বোঝাতে পারি না মনকে…”(সংগৃহিত)
মনকে শুধু একটু বোঝাতে পারলাম যে আবার ফিরে আসবো সাম্বুরু শিশুর সাথে খেলার জন্য, ফিরে আসবো নাকুরুর অদেখা গণ্ডারের জন্য,ফিরে আসবো মাউন্ট কেনিয়াত্তার চূড়ায় সূর্যোদয় দেখার জন্য , নিশ্চই ফিরে আসবো কেনিয়া । কথা দিলাম ।
বি:দ্র:-কেনিয়া সম্পর্কে আরও বেশী জানার জন্য অত্যুৎসাহীদের জন্য Jonathan Scott’s Safari Guide to East Africa বইটি পড়ার অনুরোধ রইলো।
আগের পর্বের লিংক
https://www.facebook.com/groups/BangalirBerano/permalink/3129701200627764/
https://www.facebook.com/groups/BangalirBerano/permalink/3130447400553144/
https://www.facebook.com/groups/BangalirBerano/permalink/3131219000475984/











মাসাই মারা ( পর্ব- ৩)
আজ সারাদিন মাসাই মারা গেম ড্রাইভ। সকাল সাতটার মদ্ধ্যেই প্রাতরাশ করে বেরিয়ে গেছি। একটু সকালে জন্তু জানোয়ার ভালো দেখা যায়। খুব ভোরের দিকে সিংহ চিতা লেপার্ড এরা শিকার করে। ভাগ্য ভালো থাকলে শিকার ধরার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া যায়। আমাদের ভাগ্য এত ভালো ছিল না। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন সিংহ মশাই জেব্রা কে শিকার করে সবে ভোজনে বসেছেন। সেই ভোজনবিলাস দর্শনই বা কম কি। ছোটবেলা থেকে এটাই তো এনিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেল এ দেখে এসেছি। আজ পুরো এনিম্যাল প্ল্যানেট আমার চোখের সামনে। একটু দূরে কয়েকটা শকুন অপেক্ষা করছে কখন রাজার ভোজন শেষ হবে। একেই বলে শকুনের দৃষ্টি। কিছু ইম্পালা নির্ভয়ে আসে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইম্পালাদের দলে একটাই পুরুষ ইম্পালা থাকে বাকি আট দশটা মেয়ে ইম্পালা। কোনো বেপাড়ার পুরুষ ইম্পালা সেই দলে কোনো মেয়ের সাথে ফষ্টি নষ্টি করতে গেলে তার খুব চরম অবস্থা হয়। এই সব মজার তথ্য স্যামির কাছে পেলাম। স্যামির পাখির জ্ঞান ও বেশ ভালো। আমাদের অনেক নতুন পাখি চিনিয়ে দিলো। কেনিয়ায় সবাই বিগ ফাইভ দেখতে আসে। কিন্তু কেউ যদি লাইলাক রোলার এর অহংকার আর টিক্ পাখির লিপস্টিক না দেখে ফিরে যায় তাহলে তার কেনিয়া দর্শন অপূর্ণ থেকে যায়। অন্ততঃ স্যামি তাই বলে। কেনিয়ার পক্ষী রাজ্য দেখে আমার ও তাই মনে হলো। তাই কেনিয়া ঘুরতে এলে কেউ যেন বাইনোকুলার ছাড়া না আসে।
মাসাই মারা তৃণভূমি চারণ করতে করতে কখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। যেতে যেতে যখন দেখলাম লেপার্ড বাবাজি গাছের ডালে ভাত ঘুম দিচ্ছে তখন খুব হিংসে হলো। এমন রাজকীয় ভাতঘুম এইজন্মে আর হলো না। আমরা মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য পোঁছলাম সেরেঙ্গেটি মাসাই মারা সীমান্তবর্তী এলাকায়। বেশ রোমাঞ্চকর লাগছিলো। ওপাশে তানজানিয়া এপাশে কেনিয়া মাঝখানে শুধুমাত্র কংক্রিটের একটা পিলার। মধ্যাহ্ন ভোজ বলতে বাবলা গাছের তলায় চাদর বিছিয়ে ব্রেড টোস্ট , চিকেন গ্রিল , কেক আর জুস। এগুলো সব লজ থেকে আনা হয়েছিল। খাওয়া হয়ে গেলে স্যামি সব আবর্জনা ব্যাগে ভরে গাড়িতে রেখে দিল। পুরো মাসাই মারা ঘুরে একটুও আবর্জনা একটাও প্লাষ্টিক বোতল চোখে পড়েনি। যখনি কোনো প্লাষ্টিক বোতল চোখে পড়েছে স্যামি গাড়ি থামিয়ে হিংস্র জন্তু জানোয়ার উপেক্ষা করে সেগুলো গাড়িতে তুলে নিয়েছে। মাসাই মারার আদিমতম রূপকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্যামির মতো ড্রাইভার দের অবদান অনেকখানি। এই জন্য এদের হয়তো কোনো পরিবেশবিদ পুরস্কার দেওয়া হবে না , কিন্তু এদের কাছে ভারতীয় পর্যটকদের অনেক কিছু শেখার আছে।

মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে আমাদের পরের গন্তব্য মাসাই নদী। বৃষ্টির জলে সিক্ত কাদা জলের নদী। নদীর মূল আকর্ষণ জলহস্তী আর নাইল কুমির। জলহস্তিরা তৃণ ভোজী। তাই জলহস্তীকে ভয় করার কোনো কারণ নেই ভেবে যেই একটু মাসাই নদীর কাছাকাছি পা বাড়িয়েছি অমনি কেনিয়া আর্মির লোকজন আমাকে বাধা দেয়। আসলে জলহস্তিরা বেশি লোকজন পছন্দ করে না। যদিও এরা তৃণভোজী কিন্তু কেনিয়া তে বেশির ভাগ মানুষের মৃত্যু হয় জলহস্তীর কামড়ে। ভেবেই গা টা কেমন শিউরে উঠলো। তাড়াতাড়ি নদীর মায়া ত্যাগ করে ফেরার রাস্তা ধরলাম।
লজে ফেরার পথে রাস্তায় পড়লো মাসাই দের গ্রাম। গ্রাম বলতে দশ বারোটা ছোট্ট মাটির ঘর। মাসাইরা মূলত পশুপালন এবং জঙ্গল নির্ভর জীবন যাপন করে। হাতির উপদ্রবের জন্য চাষবাস করতে পারে না। মাসাইদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা আছে। মাসাইদের বৈশিষ্ট্য হলো কাটা কর্ণছত্র এবং গায়ে পুঁতির গয়না। এদের গৃহপালিত পশুদের কর্ণছত্র কাটা থাকে। পর্যটকদের জন্য মাসাই ছেলে মেয়েরা নাচ গানের ব্যবস্থা করে। ভারী সুন্দর ওদের গান। ভাষার কোন কারিগরি নেই। শুধু কিছু শব্দ আর অদ্ভুত এক নেশা ধরা তাল। মাসাইদের বিবাহ প্রথাটিও খুব মজার। যে ছেলে যত উঁচু লাফাতে পারবে গ্রামের সব চেয়ে সুন্দরী মেয়েকে সে বিয়ে করবে। মাসাই মেয়েদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে ওদের গায়ে একটা মিষ্টি গন্ধ পেলাম। এমন শহুরে সুগন্ধির উৎস সম্পর্কে স্যামি জানালো এটা Leleshwa গাছের পাতার গন্ধ। এই গাছটি মাসাই মারা তে যত্র তত্র পাওয়া যায়। মাসাই রমণীরা এই পাতা সুগন্ধি হিসাবে বাব্যহার করে। আমিও একটা পাতা ছিড়ে গায়ে ঘষে দেখলাম সত্যি খুব সুন্দর গন্ধ। প্রকৃতি আমাদের সব কিছু দিয়ে রেখেছে। তবুও মানুষ শহর বানিয়ে সব কিছু লন্ড ভন্ড কেন করতে গেলো কে জানে।(….চলবে)
মাসাই মারা ( পর্ব-২)

নারক থেকে রাস্তাটা আবার খারাপ হতে শুরু করলো। আমাদের মাসাই মারা যেতে হলে এই নারক মারা রোড ধরেই যেতে হবে। অসম্ভব খারাপ রাস্তা। গায়ের হাড়গুলো সব খুলে যাবার উপক্রম। শুনলাম চীন এই রাস্তা বানানোর জন্য অনেক টাকা লগ্নি করেছে । ভ্রমণ মানচিত্রে মাসাই মারার গুরুত্ব চীন বেশ ভালোই জানে। স্যামির অনুমান চীন তার বিনিময়ে কত গন্ডারের সিং আর কত হাতির দাঁত নিয়ে যাবে সেটা চীন ই জানে। যেহেতু কেনিয়ান রা খুব গরিব এদের প্রলোভন দেখিয়ে দূর্ণীতিগ্রস্ত করা খুব সহজ। তারই ফলস্বরূপ আজ গন্ডার হাতি লেপার্ড এদের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে।
রাস্তাটা যদিও খুব খারাপ তবুও কিছুতেই ক্লান্তি এলো না। কারণ ততক্ষনে কিছু জিরাফ বেবুন জেবরা দেখে আরো এনারজি সঞ্চয় করে ফেলেছি। আমাদের সহযাত্রী দুই মহিলা তাড়াতাড়ি মোবাইল এ ছবি তুলে ফেস বুক এ পোস্ট করছে। তারপর দেখলাম তারা ফেস বুক এ কত লাইক পেলো কত কমেন্ট এলো সেই আলোচনা করতে ব্যস্ত। আমি বেড়াতে এলে যতটা পারি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকি। তার উপর বেরোনোর জায়গাটা যদি জঙ্গল হয় সেখানে জংলী হয়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তাই জঙ্গলে এসে এমন ভ্রমণ সঙ্গী আমার একদম পছন্দ নয়। কিছুক্ষন পরে দেখলাম আমার দুই সহযাত্রী নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।বাঁচা গেলো। বাকি রাস্তাটা শান্তিতে যাওয়া যাবে।
প্রায় ছ ঘন্টা সফর শেষ করে আমরা যখন এ এ মারা লজে পৌঁছলাম তখন দুপুর দুটো বাজে।লজটি মাসাই মারা গেম রিজার্ভের ঠিক বাইরে। গেম রিজার্ভের ভেতরেও থাকার জায়গা আছে যেমন কেকোরক। এ এ মারা লজটিও খুব সুন্দর। চারপাশটা এতো নির্জন যে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা যায় । আদিম নিস্তব্ধতা আর অনবরত পাখির ডাক, বাতাসে হিমেল হওয়া , ঝকঝকে আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে মনে হলো গলা ছেড়ে গান গাই “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ” ।কিন্তু পেটে এতো ছুঁচোর গান হচ্ছিলো যে গলা দিয়ে আর গান বেরোলো না। সোজা গেলাম ভোজনালায়ে। তাড়াতাড়ি মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে আবার আমরা বিকেল চারটের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম বিখ্যাত সেই মাসাই মারা গেম ড্রাইভে। যেহেতু আমরা ট্রাভেল এজেন্ট এর সঙ্গে গ্রূপ ট্যুর এ গিয়েছিলাম আমাদের জঙ্গলে ঢোকার টিকেট আগেই কাটা ছিল। জঙ্গলে ঢুকেই আমাদের স্বাগত জানালো সুন্দরী স্টার্লিং এর দল। তারপর একে একে দেখা পেলাম মাসাই জিরাফ ,মাসাই জেবরা, অলিভ বেবুন ক্রউনড প্লোভার, ওয়াইল্ড বিস্ট,টোপি, ইম্পালা, ওয়ার থগ ,থমসন গ্যাজেল আর নাম না জানা অসংখ্য পাখি। একটু দূরেই Loxodonta পরিবার তাদের বাচ্চাদের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছিল। আমাদের গাড়ি পাশ দিয়ে গেলেও তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ দেখলাম না। এতদিন আমরা যে হাতি, ঐরাবত গাজরাজদের দেখেছি Loxodonta Africana তাদের তুলনায় অনেক বিশালকায়। কিছুক্ষন ঘোরার পর স্যামি ওয়াকিটকি তে কি একটা মেসেজ পেলো। ওরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে তখন সোয়াহিলি ভাষায় কথা বলে। তাই কি মেসেজে বুঝতে পারিনি। দেখলাম স্যামি খুব জোরে গাড়ি চালাতে শুরু করলো। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের কেউ তাড়া করেছে কিনা। এনিম্যাল প্লানেটে এইরকম কত গল্প দেখেছি। ভয়টা কাটতে না কাটতেই একদম চোখের সামনে দেখি কিং অফ জঙ্গল বসে আছে। সঙ্গে তার দুই গার্ল ফ্রেন্ড। একটু ভাত ঘুম দিচ্ছিলেন। মনে হলো হাত বাড়ালেই ছুতে পারবো। অনেক অনেক ছবি তুললাম। কিন্তু সিংহের ঘুম ভাঙলো না। কেউ কেউ দেখলাম বিকৃত আওয়াজ করে তার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছে। এই কুরুচিটা ঠিক মানতে পারলাম না। জঙ্গলের প্রথম নিয়ম ই হলো নিস্তব্ধতা বজায় রাখা। আমরা যাদের ঘরে ঢুকেছি তাদের ঘরে ঢুকে বিরক্ত করার অধিকার আমাদের নেই। এই শিক্ষা না নিয়ে কেউ যেন জঙ্গলে না আসে।
যেতে যেতে আরেক জায়গায় থমকে দাঁড়াতে হলো। চিতা তার পাঁচ ছয় জন রংবাজ বন্ধু বান্ধব নিয়ে রাস্তার ধারে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের আড্ডা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাস্তা পেরোনো যাবে না। যতক্ষণ তাদের আড্ডা চললো আমার ক্যামেরাও চললো। চিতা যখন আড্ডা শেষ করে পথ ছাড়লো তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে উটপাখি পথ আটকালো।ততক্ষনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। দূরে রামধনু দেখা যাচ্ছে। ঐরাবতের দল ও বাড়ি ফিরছে। এক অদ্ভুত মোহময় অভিজ্ঞাতা নিয়ে লজে ফিরলাম। লজের বারান্দার আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে একটু বসে রইলাম। কখন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো। এমন নির্জন সন্ধ্যা অনেকদিন আমার প্রাপ্য ছিল। কোনো এক অজানা পোকার গান শুনতে শুনতে চোখ টা লেগে এসেছিলো। লজের কেয়ারটেকার এর জাম্বো আওয়াজ শুনে উঠে বসলাম। কেয়ারটেকার আমাদের তাড়াতাড়ি ডিনার করে নিজের ঘরে ঢুকে যেতে বললো। কারণ এই সব জায়গায় বন্য জন্তুরা কখনোই নিরাপদ নয়। (….চলবে)

মাসাই মারা (পর্ব- ১ )
আমার জঙ্গলে প্রেম শুরু বুদ্ধদেব গুহার গল্প পরে। জঙ্গলে মানেই মনে হয় স্বপ্নের পৃথিবী। তাই যখন গরমের ছুটির গন্তব্য খুঁজতে বসলাম সবার আগে মনে হলো মাসাই মারা। এর আগে প্রকৃত জঙ্গলে বলতে জিম করবেট যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। জিম করবেট গিয়ে পাহাড় নদী আর জঙ্গলের অপূর্ব মেলবন্ধন দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে যদি স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তা এখানেই আছে। সেই যে আমার মধ্যে জঙ্গল প্রেম সংক্রামিত হলো সেটা আর কোনোদিন ছাড়বে না।
মাসাই মারা যাওয়ার উপযুক্ত সময় জুলাই অগাস্ট মাস। আমাদের যাবার তারিখ ঠিক হলো আঠাশে জুন। পাঁচ দিনের সফর সূচি। এই সময় তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি থেকে প্রচুর জন্তু জানোয়ার মাসাই মারা তে প্রবেশ করে খাবারের খোঁজে। যাকে বলে গ্রেট মাইগ্রেশন। মাসাই মারা সাভানা তৃণভূমির অন্তর্গত। তাই এই সময় বিস্তীর্ন অঞ্চল জুড়ে নানারকম জন্তু জানোয়ারদের অবাধ প্রদর্শন আমার মতো জঙ্গল প্রেমীদের মাসাই মারা টেনে আনে।
আমরা গেছিলাম হলিডে ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে ।প্রথম দিন দুপুরে নাইরোবির জোমো কেনিয়াত্তা এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছলাম তখন মেঘলা আকাশ। হালকা ঠান্ডা হওয়া বইছে। আকাশে বাতাসে যেন একটা আদিম আফ্রিকার গন্ধ। এই সেই আফ্রিকা যেখানে আদিম মনুষ্য জাতির উৎপত্তি। এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেল ট্যামারিন্ড ট্রির দূরত্ব যদিও ২০ কিমি তবুও নাইরোবির ভয়ঙ্কর ট্রাফিক ঠেলে হোটেল পৌঁছতে দুই আড়াই ঘন্টা লেগে গেলো। নাইরোবি শহরে ঢুকে মনেই হলো না যে এটা ভারতের কোনো শহর নয়। সব কিছুই তো আমাদের মতো, বিল্ডিং অফিস বাড়ি ঘর রাস্তাঘাট গাড়ি ,শুধু মানুষগুলো দেখতে একটু আলাদা। মেয়েদের চুলে হাজার বিনুনি করা আর ছেলেরা বেশিরভাগ ন্যাড়া। আরেকটা জিনিস ভারতের শহরগুলোর থেকে আলাদা , নাইরোবি প্লাষ্টিক বর্জিত শহর। প্লাস্টিকের ব্যবহার এখানে দণ্ডনীয় অপরাধ।
ট্যামারিন্ড ট্রি হোটেলটি খুব সুন্দর সাজানো গোছানো। খাওয়া দেওয়ার ব্যবস্থাও বেশ ভালো। যদিও দু বোতল জলের দাম দিতে হয়েছিল চোদ্দোশো কেনিয়ান সিলিং। নাইরোবিতে জলের দাম খুব বেশি। ট্যামারিন্ড ট্রি হোটেল চত্বরেই রয়েছে নাইরোবির বিখ্যাত কার্নিভর রেস্টুরেন্ট যেখানে কুমিরের মাংস সহ আরো নানারকম অদ্ভুত জন্তু জানোয়ারের মাংস পাওয়া যায়। আমার যাওয়ার খুব একটা উৎসাহ হয়নি। কারণ আমার মনে হয় শুধুমাত্র মজার ছলে মাংস খাওয়ার নাম করে এই রকম প্রচেষ্টাকে উৎসাহ দেওয়ার মানে প্রকৃতির সঙ্গে বিস্বাসঘাতকতা করা।
পরের দিন প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম মাসাইমারার উদ্দেশ্যে। আমাদের সঙ্গে ছিল জঙ্গল সাফারির জন্য উপযুক্ত ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি আর আমাদের সারথি মিঃ স্যামি। নাইরোবি থেকে মাসাই মারা যেতে সময় লাগে প্রায় ছয় ঘন্টা। শহর থেকে বেরিয়ে ঘন্টা খানেক যেতেই পড়লো গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি। কেনিয়ার ভৌগোলিক ইতিহাসে গ্রেট রিফ্ট ভ্যালির অবদান অনস্বীকার্য। কেনিয়ার বেশিরভাগ লেকই এই গ্রেট রিফ্ট ভ্যালির অন্তর্গত। তার মধ্যে দুটি নাকুরু এবং নাইভসা আমাদের ভ্রমণসূচির অন্তর্ভুক্ত। গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি তে কিছুক্ষন কাটিয়ে ছবি তুলে আমরা আবার চললাম মাসাই মারার উদ্দেশ্যে। রাস্তাঘাট মোটামুটি ভালো। দুপাশে শুধু বাবলা গাছ আর তৃণ ভূমির বৈশিষ্ট। কখনো কখনো ছোট খাটো দু একটা বাড়ি আর দোকান। কেনিয়ার পঞ্চাশ শতাংশ লোক দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। ঘর বাড়ি দেখে সেটা বোঝা গেলো। বাকি পঞ্চাশ শতাংশ উচ্চবিত্ত। কেনিয়া তে কোনো মধ্যবিত্ত নেই। রাস্তায় যেতে যেতে ড্রাইভার এবং গাইড স্যামির কাছে তাদের জীবন যুদ্ধের গল্প শুনছিলাম। স্যামি একসময় মাসাই জাতির যোদ্ধা ছিল। মাসাই গ্রামে থাকতো , শিকার করতো প্রকৃতির মধ্যে আদিম জীবন যাপন করতো। একদিন মিশনারিজরা এসে ওদের খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করলো , সভ্যতার আলো দেখালো, ইংরেজি পড়তে শেখালো। আদিম প্রকৃতির অসভ্য মায়াজাল থেকে বের করে সুসভ্য কংক্রিটের দুনিয়ায় নিয়ে এলো। স্যামি এখন মাসাই যোদ্ধা থেকে ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির ড্রাইভার। অনেকটাই বেশি উপার্জন করে। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা শেখাচ্ছে। একটা কঙ্ক্রীটের ভালো ঘর আছে নিজের। জিজ্ঞেস করলাম এই ড্রাইভারের কাজ করে তাহলে অনেক ভালো আছো , তাই না ?বললো, ভালোই তো আছি। কিন্তু তার মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস ছিল সেটা বোঝার আগেই গাড়িতে সবাই হই হই করে উঠলো , ওই দেখো একটা জেবরা মাঠে ঘাস খাচ্ছে। আমরাও সবাই এই প্রথম দেখলাম আর পাঁচটা গরু ছাগলের মতো জেবরা মাঠে ঘাস খাচ্ছে। এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখেছিলাম বাবলা গাছের জঙ্গলে জিরাফ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই না হলে আফ্রিকা। মনটা ভালো হয়ে গেলো। …..( চলবে)



দারিংবাড়ি-The Kashmir of Odisha
◦ জুলাই মাসে কলকাতা মানে প্যাচপ্যাচে গরম, যখন তখন বৃষ্টি আর দমবন্ধ করা গুমোট আকাশ। এইসব থেকে বাঁচতে কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ….
◦ বহু ব্যয় করি বহু ক্রোশ দূরে বহু দিন ধরি বহু দেশ ঘুরে/দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু/দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া /একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু…সুইজারল্যান্ড টুইজারল্যান্ড তো অনেক হলো এবার না হয় একটু খোঁজ করা যাক “একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু”।সেই শিশির বিন্দুর খোঁজে তল্পি তল্পা বেঁধে হাজির হলাম হাওড়া স্টেশন।
◦ ফলকনামা এক্সপ্রেস যথা সময়েই স্টেশন ছাড়ল ।অনেকদিন পর ট্রেনের কু ঝিকঝিক শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি, সোঁদা মাটীর গন্ধ আর দিগন্ত বিস্তৃত খোলা আকাশ।মাঠ ঘাট পুকুর নদী পার হয়ে কখন যে কটক স্টেশন পৌঁছে গেছি বুঝতে পারিনি।যদিও পৌঁছনোর কথা ছিল ব্রহ্মপুর কিন্তু শেষ মুহুর্তে ticket পাওয়া যায়নি।
◦ যাইহোক কটকে আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল পীটার। কটক থেকে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগবে প্রায় ছ’ঘন্টা।তাই দেরী না করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম । NH59 ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল।আমার উড়িষ্যা প্রেম বুদ্ধদেব গুহর লেখা পড়ে। ঋজুদার সমগ্রতে অনেক গল্পই উড়িষ্যার জঙ্গল কেন্দ্রিক। সেই কারনে ছেলের নামও রেখেছিলাম ঋজু।সে আরেক গল্প। এখন দুপাশে শুধু চোখ জুড়োনো সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে লাল মাটীর মনোক্রম।কটক থেকে খাল্লিকোট যখন পৌঁছলাম তখন বিকেল প্রায় গড়িয়ে এসেছে।খাল্লিকোট থেকে রাস্তা একটু খারাপ। তার উপর বৃষ্টি। গন্তব্য এখনও অনেক দূর।আকাশ যখন নিকট বন্ধু পথই যখন ঘর তখন কুছ পরোয়া নেহি।একটু পরেই শুরু হলো গন্জাম জেলা তারপর চড়াই । রাস্তার দুপাশে গাছেদের আত্মীয়তায় আকাশটা কখন গৌণ হয়ে গেছে। পীটার বলল, আপনাদের ভাগ্য ভালো থাকলে হাতির দেখা পেতে পারেন। পীটার গাড়ীর ড্রাইভার।এই এলাকাটা হাতিদের চারনভূমি। কিন্তু ঐরাবতদের স্বর্গে শহুরে ভূত দেখে গজকুল যে খুব একটা খুশি হয়নি সেটা বোঝাই গেল। আমাদের ঐরাবত দর্শনের ইছ্ছা পূর্ন হোলো না।অবশেষে আমরা যখন দারিংবারি ইকো রিসর্টে পৌঁছলাম তখন রাত আটটা।পৌঁছেই গরম গরম রুটী মাংসের ঝোল আর করকরে আলুভাজা দিয়ে ডিনার। তারপর ব্যাঙেদের কনসার্ট শুনতে শুনতে লম্বা ঘুম। শরীরে পথের ক্লান্তির কোনো চিহ্নই রইলো না।
◦ রোজ গাড়ির হর্নে ঘুম ভাঙে। আজ অনেকদিন পর পাখির কলরবে ঘুম ভাঙল।বাইরে এসে দাঁড়াতেই আবার সেই দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ কালো মেঘ আর সবুজ পাহাড়। চারিদিকে মন ভালো করা এক স্বর্গীয় নির্জনতা। যেন ইছ্ছে করলেই গলা ছেড়ে গাইতে পারি…. মেঘমল্লারে সারাদিনমান বাজে ঝরণারও গান/ মন হারাবার আজ বেলা পথ ভুলিবার খেলা/মন চায় ওই বলাকারও পথখানি নিতে চিনে/ আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে….
◦ আবেগে সময় নষ্ট না করে লুচি তরকারি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম অজানা দারিংবারির খোঁজে। সঙ্গে সারথী পীটার। দারিংবারিকে বলা হয় কাশ্মীর অফ ওডিশা। উচ্চতা প্রায় ৩০০০ ফিট।মূলত কোন্দ উপজাতির বাসভূমি।কোন্দরা পৃথিবীর প্রাচীন উপজাতিদের মধ্যে অন্যতম। দারিং সাহেবের কল্যানে কোন্দ দের একটি গোষ্ঠী খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত।খুব সহজ সরল জীবনযাপন । শহুরে দূষন এখনও কোন্দদের স্পর্শ করেনি।কোন্দদের প্রধান জীবিকা পশুপালন ধানচাষ হলুদ চাষ গোলমরিচ চাষ। কফির বাগানও আছে। কোন্দদের গ্রাম দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম পুতুদি জলপ্রপাতের কাছে। ছোট্ট প্রপাত কিন্তু অতুলনীয় নৈসর্গিক সৌন্দর্য । আমাদের সফরসঙ্গী বলতে অসংখ্য রঙীন প্রজাপতি। আমি প্রায় পনেরো ধরনের প্রজাপতি দেখেছি দারিংবারিতে। পুতুদি প্রপাত থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম পিকনিক স্পট, সাইলেন্ট ভ্যালি, দুলুরি নদী,কফি গার্ডেন আর এমু পাখির ফার্ম দেখতে। ইকো রিসর্টে ফিরে ডাল ভাত পটলের তরকারি আলুভাজা আর মাছের ঝোল দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে আরাম করে ভাতঘুম। সন্ধ্যায় পকোরা আর চায়ের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা। পরের দিন আমাদের গন্তব্য ডোকরা গ্রাম দেখে মন্দাসারু।
◦ দারিংবারির মূল আকর্ষন সবুজ পাহাড় বেয়ে পাইনের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া একাকী পথের স্বর্গীয় নির্জনতা। ট্রাফিক জ্যাম বলতে গরু ছাগলের প্যারেড আবার কখনো গাছের ডালে ফিংয়ে পাখিদের জরুরী বৈঠক। ডোকরা গ্রামে আমাদের আপ্যায়ন করা হলো ঢোল মাদল আর বাঁশিতে। ঢোল মাদলের সঙ্গে আমরাও একটু কোমর দোলালাম।মানুষগুলো সবাই শিল্পী। আমাদের সংক্ষিপ্ত উপস্হিতিতে তাদের খুশী ছিল দেখার মতো।ডোকরার কিছু কেনাকাটি সেরে আমরা চলতে শুরু করলাম মন্দাসারুর দিকে।
◦ বহু বছর আগে পাহাড়ের একটা অংশ ভূমিকম্পের ফলে হঠাৎ উঁচু হয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় মন্দাসারু। বর্নণাতীত প্রাকৃতিক নৈসর্গের অতুলনীয় নিদর্শন মন্দাসারু।পাহাড়ের খাঁজে বয়ে চলেছে ক্ষীনকায়া এক নদী। কান্ধামাল ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টের একটা কাঠের বনবাংলো আছে। মন্দাসারুর বাসিন্দাদের মধ্যে অন্যতম গোল্ডেন গেকো, ইন্ডিয়ান জায়েন্ট স্কুইরাল, অটার,গ্রে হেডেড ক্যানারী ফ্লাই ক্যাচার, আর অসংখ্য বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ। গোটা কান্ধামাল জুড়েই আছে বিরল প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ যেমন অরক্সিলাম ইন্ডিকাম, স্টেরিওসপারমাম স্যুভিওলেনস, অ্যাবুটিলিওন ইন্ডিকাম ইত্যাদি। অত্যুৎসাহীদের জন্য ডারিংবারিতে ভেষজ উদ্ভিদের একটি গার্ডেন আছে। মন্দাসারুর ছবির মতো সুন্দর বাংলো দেখে খুব ইছ্ছে করছিল একদিন কাটাতে।কিন্তু পরেরদিন আমাদের ফেরার ticket কাটা ছিল। তাই মন খারাপ করে দারিংবারি ফিরে আসতেই হলো।
◦ এবার ফেরার পালা। ব্রহ্মপুর থেকে আমাদের ট্রেন বিকেল পাঁচটায়। ম্যাথুজী আগের থেকেই সকাল সকাল ড্রাইভারকে আসতে বলে দিয়েছিল।দারিংবারি এলে ম্যাথুজীর সাহায্য ছাড়া ঘোরা সম্ভব নয়। তাই ম্যাথুজীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ দারিংবারি ইকো রিসর্টের সমস্ত কর্মীকে। দুটোদিন এই সহজ সরল মানুষদের আতিথেয়তায় ভুলেই গেছিলাম আমাদের শহুরে পরিচয়।
◦ ফেরার পথে আমরা গেলাম চন্দ্রগিরি পদ্মসম্ভব বৌদ্ধ মহাবিহার। পাহাড়ের কোলে লুকানো এক তিব্বতি মনাষ্ট্রী। গাছপালা ফুল দিয়ে সাজানো শান্ত সুন্দর এক আশ্রম।বাতাসে ছড়িয়ে আছে “ওম্ মণি পদ্মে হুম”। চারপাশে লামা শিশুদের আনাগোনা।চন্দ্রগিরির এই নির্জন প্রকৃতির কোলে বুদ্ধের বিশালকায় মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে সত্যি কষ্ট হয় পৃথিবীতে এখনও যুদ্ধ আছে।মনাষ্ট্রীর ভেতরের থাংকা পেইন্টিং গুলো অসাধারন যদিও ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। ব্রহ্মপুরের পথে এই তিব্বতি মনাষ্ট্রী অবশ্যই এক উপরি পাওনা। এছাড়াও রাস্তার ধারে পড়বে তপ্তপানি, গরম জলের কুন্ড। কুন্ডকে ঘিরে প্রাচীন এক শিব মন্দির। এখানে শিব দশভূজ। শিবের মন্দিরে প্রনাম করে যখন বেরোলাম তখন অঝোরে বৃষ্টি। বৃষ্টি আর সবুজের ঘোরে পথটা কখন ব্রহ্মপুর স্টেশনে এসে শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। একটু পরেই প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে পড়বে আর একটু পরেই আবার পৌঁছে যাবো সেই কালো ধোঁয়া আর কংক্রীটের জংগলে। একটু পরেই স্বপ্ন হয়ে জমে থাকা সব সবুজ মুছে যাবে ক্লান্তির ঘর্মাক্ত জলে। যদি আমিও পারতাম রবীন্দ্রনাথের মতো লিখে যেতে……
◦ আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক
◦ আমি চাইনা হতে নববঙ্গে নব যুগের চালক……..
◦ আমি নাই বা গেলাম বিলাত
◦ নাই বা পেলাম রাজার খিলাত
◦ যদি পরজন্মে পাইরে হতে ব্রজের রাখাল বালক
◦ তবে নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে সুসভ্যতার আলোক

◦
দারিংবারি ইকো রিসর্ট
বুকিং এর জন্য যোগাযোগ
মাথিয়াস দিগাল বা ম্যাথু-৯৪৩৭০৬১৭৪১
থাকা খাওয়া ঘোরা এবং স্টেশন যাওয়া আসা নিয়ে প্যাকেজ







তুমি রবে নীরবে

মার্চ মাস।স্কুলের পরীক্ষা শেষ।প্রতি বছরের মতো এবছরও দুবাই বং কানেকশন বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।এবার বিষয় রবীন্দ্রনাথ।উদ্দেশ্য প্রবাসী বাচ্চাদের নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে একটু পরিচয় করানো।
অদিতি অনেক জোর করছে আমার ছেলে ঋজূ কে দিয়ে কাবুলিওয়ালা নাটকে কাবুলিওয়ালার রোলটা করাবে। ঋজূ ক্লাস এইট। ওর হাইট অনুযায়ী কাবুলিওয়ালার ভূমিকায় ওকে খুব মানাবে।এর আগেও দূর্গা পূজোর সময় ঋজুকে অসুর সাজতে হয়েছিল।তখন ছোটো ছিল বলে কোনোমতে রাজী করানো হয়েছিল।এখন ঋজু কিছুতেই রাজী নয়।যখন বললাম অদিতি আন্টি তোকে দেখা করতে বলেছে,অমনি রেগে গেল। বলল, আন্টি কে বলে দাও আমি আর ওই বাঙালী নাটক করব না।আমি এখন বড় হয়ে গেছি।বড় হওয়ার সঙ্গে বাঙালী নাটকের কি সম্পর্ক বুঝলাম না।আজকাল কথায় কথায় এমনি উত্তর পাওয়া যায়।এখন ওরা যাকে বলে রেবেলিয়ন টীন।দূর্গা পূজোর সময় বললাম, বাবা, অষ্টমীর দিনে একটু ধুতি পান্জাবী টা পর,তোকে কত সুন্দর লাগে।সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল,আমাকে ওই বাঙালী ড্রেস পরতে বোলো না তো।ইট্ লুকস্ ফানি.বন্ধুরা দেখলে হাসবে।যাইহোক অদিতি এসে শেষ পর্যন্ত ঋজু কে রাজী করালো। অদিতি ওকে ছোটবেলা থেকে জানে।শর্ত একটাই যে ওকে ওর নতুন গীটারে একটা রক মিউজ়িক পারফর্ম করতে দেওয়া হবে।
আমি পরের দিন আমার স্কুল লাইব্রেরী থেকে কাবুলিওয়ালা বইটা এনে দিলাম।মা লাইব্রেরীয়ান হলেও ছেলের বই পড়ার অভ্যেসটা তৈরী করতে পারিনি।তবুও চেষ্টা করি যদি একটু পড়ে।পি এস পি, কার্টুন, হোয়াটস্ আ্যপ এসবের বাইরে যদি কখনও গল্পের বই ধরে তাহলে ঋজুর ফেভারিট জেফ্ কেনি অথবা ড্যারেন শন।এখন একটু বড় হয়েছে তাই কখনও ক্রীস্টোফার পাওলিনি বা রিক্ রিওরডানও পড়ে।আফটার অল দে আর নিউ জেনারেশন এন আর আই স্মার্ট কিডস্।রবীন্দ্রনাথ মানে ওরা শুধু জানে রাইটার অফ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যানথেম।
বইটা দু তিন দিন এমনিই টেবিলে পড়ে রইল। আমি কয়েকবার বললাম, ঋজূ গল্পটা পড়লে তোর ডায়লগ বলতে সুবিধা হবে।সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল,তুমি চিন্তা কোরো না সব হয়ে যাবে। আবার হোয়াটস্ আ্যপ এ মন দিল।
সেদিন দেখলাম ঋজূ অনেকক্ষন হোয়াটস্ আ্যপএ চ্যাট করে বোর হয়ে গিয়ে টেবিলে রাখা বইটা তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছে।আমি রান্না ঘরে ছিলাম। কিছুক্ষন পরে বেরিয়ে এসে দেখনাম ঋজূ কাবুলিওয়ালা পড়ছে। দু গাল বেয়ে জলের রেথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঋজূ কাঁদছিস কেন? ঋজূ চোখের জল না মুছেই বই থেকে মাথা তুলে বলল, মা, মিনি তো কাবুলিওয়ালাকে চিনতেই পারল না।আমি বললাম, তাতে কাঁদার কি আছে। ও বলল, এর আগে কোনদিন স্টোরী বুক পড়ে কাঁদিনি।তুমি আমাকে আর এই স্যাড স্টোরী দিও না।আমি বললাম, আচ্ছা লাইব্রেরীতে একটা নতুন রিক্ রিওরডানের বই এসেছে, তোর জন্য নিয়ে
আসব।ও বলল, রিক্ রিওরডান না,তুমি বরং আমাকে কাবুলিওয়ালার মতো রবীন্দ্রনাথের একটা হ্যাপী স্টোরী এনে দিও। বুঝলাম, মিনি হয়ত কাবুলিওয়ালা কে বড হয়ে চিনতে পারেনি কিন্তু আমার স্মার্ট কিড কাবুলিওয়ালার বাঙালী স্রষ্টা কে যে কোনোদিন ভুলবে না তার গল্প লেখা হয়ে গেল।
কফি হাউস

প্রবাসে ছুটির দিন মানে দেরি করে ঘুম ভাঙা, দুপুরে ভরপেট ফ্রোজেন মাছের ঝোল ভাত, তারপর নাক ডেকে ভাতঘুম। আর দিনভর মান্না দে সন্ধ্যা হেমন্ত কিশোরের মন কেমন করা গান।আর মান্না দে মানেই কফি হাউস মাস্ট।এসবের মাঝে বাপ ছেলের মধ্যে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ছোটখাটো মহড়া, কখনো মান্না দে বনাম জাস্টিন বেইবার কখনো সৌরভ গাঙ্গুলি বনাম মাইকেল জর্ডান কখনো ইলিশ বনাম ম্যাক ডোনাল্ড। ঋজুর যখন বছর দুই বয়েস তখন কলকাতা ছেড়ে আরব সাগর পেরিয়ে চলে এসেছি। কাজেই ঋজুর রক্তে ভাগীরথীর মিস্টি জলের থেকে আরব সাগরের নোনা জলই বেশী। তাই জাস্টিন বেইবার মাইকেল জর্ডান বা ম্যাকডোনাল্ডদের দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। সেটা মা যদিও বা বোঝে বাবা কিছুতেই বুঝতে চায় না। ঋজুর কিছু করার নেই ।অতএব প্যানপ্যনে ঘ্যানঘ্যনে মান্না দে কিশোর কুমার আর কফি হাউস জিন্দাবাদ।
সেদিন ছিল ছুটির দিন। ঋজু তখন ক্লাস সিক্স।সকাল থেকেই ঋজু চুপচাপ।আগের দিন হসপিটালে সৃজনের ব্যান্ডেজ বাঁধা নিথর দেহটা দেখে আসার পর প্রায় সারারাতই কেঁদেছে। মনটা আমারও খারাপ ছিল । সৃজনের মৃত্যু সন্দীপের মৃত্যু মনে করিয়ে দিল।সৃজন ঋজুর ক্লাসমেট।ক্লাস ওয়ান থেকেই একসঙ্গে।পড়াশুনোয় ভালো,খুব শান্ত ছেলে। ঋজু ক্লাসে খুব বেশী কথা বলে তাই টীচার সৃজনকে ঋজুর পার্টনার করে দিয়েছে। সৃজনকে ঋজু খুব একটা পছন্দ করে তা নয়।ছেলেটা নাকি সারাক্ষণই ওকে উপদেশ দেয়,ক্লাসে টীচার থাকলে কথা বলতে নেই,হোমওয়ার্ক করিসনি কেন, বেশী ছুটোছুটি করলে পড়ে যাবি এইসব আরকি।এইরকম একটা ছেলে কেন যে সুইসাইড করল কে জানে। শুনেছিলাম বাবার কাছে আব্দার করেছিল বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে যাবে বলে। বাবা না বলায় সাত তলার ব্যলকানি থেকে ঝাঁপ দেয়।ঋজু বেশ কিছুদিন স্কুল থেকে ফিরে বলত, মা আজও সৃজন আসেনি,আজও সৃজনের চেয়ারটা ফাঁকা ছিল,ও কি আর কোনোদিনও আসবে না?কখনো লুকিয়ে কাঁদত। কেউ ছেড়ে দিয়ে যায়, কেউ ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।ওই বয়সে এই সত্যিটা বুঝতে সময় লেগেছিল।
ছুটির দিন মানে কখনো কখনো পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা খাওয়া দাওয়া,মাছ পাতুরি পুর ভরা পটল ইত্যাদি ইত্যাদি ।সেদিন তনুশ্রীরা এসেছিল।তনুশ্রী আমার বোনের বন্ধু। চাকরীসূত্রে সদ্য প্রবাসী। তনুশ্রীর বর শুভঙ্কর ভালো গীটার বাজায়, তার ওপর মান্নাদের অন্ধ ভক্ত। এমন সুবর্ণ যোগে কফিহাউস তো হবেই।খাওয়া দাওয়া সেরে পোষ্ট লান্চ আড্ডায় গীটারের সুরে আমরা সবাই মিলে গলা মেলালাম একমাত্র ঋজু ছাড়া। ঋজু একটু বিরক্ত হয়ে বলল তোমাদের কি যে কফি হাউস ভালো লাগে কে জানে।তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।আমি বললাম যেদিন এই গানের মর্ম বুঝবি সেদিন তুইও শুনবি।তনুশ্রী বলল,ঋজু অনেক বড় হয়ে গেছে, যখন ছোট্ট ছিল কত মিষ্টি ছিল।ঋজু সত্যিই বড় হয়ে গেছে। ক্লাস এইট এ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছোটোবেলার সারল্যটা হারিয়ে গেছে। যা কিছু বাবা মা চায় কোনোকিছুই ওর ভালো লাগে না। সারাদিন বাস্কেটবল ইংলিশ গান গীটার জাস্টিন বেইবার এইসব নিয়েই মেতে আছে। সেদিন রাত বারোটার সময় কোনো একটা মেয়ে ফোন করে বলল, ঋজু ইউ আর সো কিউট।আর ফোনটা আমিই ধরেছিলাম।আমি তো রেগেই আগুন।কাঁদতে কাঁদতে বলল মেয়েটাকে ও নাকি চেনেই না, কেউ হয়তো মজা করেছে।তারপর তিনদিন কথা বন্ধ। সব শুনে তনুশ্রী বলল,তুমি না জয়া বচ্চনের মতো হয়ে যাচ্ছ ।আমি ভাবলাম তনুশ্রী হয়তো আমার প্রশংসা করল। তারপর বলল, বেচারা ঋজু ।ক্লাস নাইনের ছেলেকে কোনো মেয়ে কিউট বলবে না তো কি ছেলের বাবাকে বলবে?এবার বুঝলাম কি বলতে চাইল।
একদিন ছুটির দিনে ঘর পরিষ্কার করছি।ঋজুর পড়ার টেবিলের উপর জাস্টিন বেইবারের ছবিটা প্রায় ছিড়েই গেছিল। ভাবলাম ওটা ফেলেই দি।ছবিটা ফেলতে গিয়ে দেখি পিছনে লেখা টু ঋজু ফ্রম অনুষা। ঋজুর সব বন্ধুদেরই আমি চিনি,কিন্তু এই মেয়েটাকে চিনি না। তাহলে কি……।যে ছেলের মায়ের প্রতি এতটাই আনুগত্য যে ঘরে টয়লেটে গেলেও বলে যায় সেই ছেলে কিনা মাকে লুকিয়ে…. । উ:!আমি আর ভাবতে পারছি না। তনুশ্রীর কথাটাই কি তাহলে ঠিক?আমি কি খুব বেশী শাসন করে ফেলছি?সৃজনের কথাটাও মাথায় এল। চেষ্টা করলাম একটু নরম হওয়ার। বন্ধুর মতো মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ঋজু , অনুষা কে রে? ঋজু একটু ভয়ে ভয়ে বলল অনুষা গীটার ক্লাসে একসাথে শিখত। দুবছর আগে কার অ্যাক্সিডন্টে বাবা মা মারা যাওয়ার পর এখন লন্ডনে পিসির কাছে থাকে। ওর পিসি নাকি খুব বড়লোক। অনুষা নাকি এবছর নিজের একটা মিউজিক আ্যলবামও বের করছে। বেইবারের ছবিটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, ছবিটা তুমি ফেলে দিচ্ছ কেন? আবার একটু পরেই বলল আচ্ছা ফেলে দাও।আমি বললাম তুই রাখতে চাইলে রাখ।ও বলল না। একদিন ঋজু গীটার ক্লাস থেকে দেরি করে ফিরেছিল বলে খুব বকেছিলাম। সেদিন গীটার ক্লাসের বন্ধুরা অনুষাকে নিয়ে পিৎজা হাট গেছিল ওকে ফেয়ারওয়েল দিতে। সেদিন অনুষা ওকে বেইবারের ওই পোস্টারটা গিফ্ট দিয়েছিল।তার পরের দিন অনুষা লন্ডন চলে যায়।
আজ ঋজু আবার চুপচাপ। কয়েকদিন আগেই পিরিওডিক টেস্ট শেষ হয়েছে। অঙ্কে একটু কম নম্বর হয়েছে। তাই ভাবলাম হয়তো মন খারাপ। কয়েকমাস পরেই ক্লাস টেনের ফাইনাল পরীক্ষা।বললাম মন খারাপ না করে অঙ্কটা আরো বেশী করে প্র্যাকটিস কর। আজ আর কফি হাউস শুনলাম না যাতে ওর পড়ার ডিসটার্ব হয়।পড়ার টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেখে এলাম। খেতে খেতে বলল মা জানো আদিব আজ রাতের ফ্লাইটে কানাডা চলে যাচ্ছে, আর এখানে ফিরবে না। আদিব ঋজুর সঙ্গে ক্লাস ফাইভ থেকে পড়ে। খুব ভালো কবিতা লেখে।দুজনে হরিহর আত্মা বন্ধু।ঋজু যদিও কবিতা লিখতে পারে না কিন্তু স্কুল ম্যাগাজিনে আদিবের কবিতা ছাপার আগে ঋজুকে পড়ে ভালো বলতেই হবে। ক্লাসে টীচার কোনো কারনে শাস্তি দিলে দুজনেই শাস্তি পায়। ঋজুর প্রত্যেক জন্মদিনে নেমন্তন্য হোক বা না হোক আদিব আসবেই। আদিবের পোষা কুকুরটা সবাইকে ভৌ ভৌ করে তেড়ে আসে, কিন্তু ঋজুর সঙ্গে খুব দোস্তি।
ঋজু ব্রেকফাস্ট খেয়ে পড়তে বসে গেল। তার আগে একবার জিজ্ঞেস করল, মা কফি হাউস গানটা কার লেখা? আমি একটু অবাক হলাম। কিছুক্ষন পর আমি আমার কাজ সেরে ঋজুর কাছে গেলাম, অঙ্কের কোনো হেল্প দরকার কিনা জানার জন্য।দেখলাম সামনে অঙ্কের বই খোলা, চোখ বন্ধ, কানে হেডফোন। অন্যদিন হলে হয়তো খুব রেগে যেতাম। আজ আর কিছু বললাম না। কারন আমি জানি ঋজু কাঁদছে। আজ কিন্তু ওর সঙ্গে জাস্টিন বেইবার নেই।আজ ওর সঙ্গে নিখিলেশ সুজাতা মঈদুল ডিসুজা……। ঋজু হয়তো কোনোদিন কফি হাউসের গান লিখতে পারবে না, হয়তো কোনোদিন মান্না দের কফি হাউস গাইতে পারবে না কিন্তু সৃজন অনুষা আদিবকে সারা জীবন এই কফি হাউসেই খুঁজে যাবে যেমন আমি আজও খুঁজি সন্দীপকে অনন্যা কে।জাস্টীন বেইবাররা কোনোদিন সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না।
সমাপ্ত
◦
ফেসবুক লাইভ
তখন রাত বারোটা বাজে।চায়ের দোকান বন্ধ করে বিল্টু তখন বাড়ি ফিরছে।সংগে জগা হাবু আর রাজু।বাসস্ট্যান্ডের কাছেই কারোর চায়ের দোকান কারোর কোল্ড ড্রিংক্সের দোকান
কারোর স্টেশনারী দোকান।বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। রাতের শেষ বাসটা যাওয়ার পর রোজই সবাই মিলে দোকান বন্ধ করে এই সময় বাড়ি
ফেরে।জগা আর হাবু বলাবলি করছিল আজ রাতে বৃষ্টিটা বেশ ভালোই হবে মনে হছ্ছে।হাবু বলল নাও হতে পারে, সবে তো জুলাই মাসের শুরু। এই সময়টায় কলকাতায় যা প্যাচপ্যাচে গরম, একটু বৃষ্টি হলে ভালো হতো।কবে যে একটা এসি কেনার ক্ষমতা হবে কে জানে।রাজু বলল তুই এসি কেনার কথা ভাবছিস আমার তো মাসের শেষে দেখি খাওয়ারই পয়সা নেই। তার উপর বাবার ওষুধ কেনার খরচ। বাবার জন্য খুব চিন্তা হয় বুঝলি। কলকাতার বড় বড় নার্সিংহোমে দেখানোর তো ক্ষমতা নেই। সরকারী হসপিটালই ভরসা। সেটাও যা তা।কলকাতাটা
এখন শুধুই নেতা আর বড়লোকদের জন্য।বিল্টু বলল সেটা আর নতুন কি বললি, ওটা আগেও ছিল এখনো আছে পরেও থাকবে।
বাসস্ট্যান্ডে তখন লোকজন নেই বললেই চলে। চারপাশের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে।কয়েকটা ভবঘুরে ভিখারী বাসস্ট্যান্ডের বেন্চ দখল করে নিশ্চিন্তে ঘুমোছ্ছে।বৃষ্টির জন্য রাস্তার কুকুর গুলো বাসস্ট্যন্ডে আশ্রয় নিয়েছে।বৃষ্টিটা তখন বেশ জোরেই পড়তে শুরু করেছে।জগা বলল দাঁডিয়ে যা, না হলে ভিজে
যাবি। সংগে ছাতাও নেই।রোজকার এই পরিচিত দৃশ্যের মধ্যে বাসস্ট্যান্ডের এখনকার দৃশ্যটা হঠাৎ একটু অন্যরকম লাগল বিল্টুদের।একজন বৃদ্ধ, বয়স পঁচাত্তরের মতো হবে বাসস্ট্যান্ডের বেন্চির এককোনে বসে আছে।কাঁধে একটা ঝোলা ব্যগ, পরনে ধুতি হাফ হাতা খদ্দরের কুর্তা,একটু নোংরা ।তবু বয়স্ক মানুষটাকে দেখে মনে হলো কোনো ভালো ঘরের লোকই হবে।চুপচাপ ভিখারীদের সংগে আ্যাডজাস্ট করে এককোনায় বসে আছে।বিল্টু একটু এগিয়ে জিজ্ঞেস করল মেসোমসাই লাস্ট বাস তো চলে গেছে,এত রাতে আপনি কোথায় জাবেন? বৃদ্ধ খুব ধীরে উত্তর দিল, না বাবা কোথাও যাব না, রাতটা এখানেই থাকব।বিল্টুর মনে একটু খট্ কা লাগল। তারপর চারজনে মিলে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করে যা জানা গেল সেটা এইরকম, বৃদ্ধর দুই ছেলে। বড় ছেলে আমেরিকায় থাকে, ছোট ছেলের কলকাতা সাউথ সিটিতে ফ্ল্যাট আছে। বৃদ্ধ এতদিন ছোট ছেলের কাছেই থাকত। ছোট ছেলের বউ এর সাথে বনিবনা না হওয়ায় বৌমার কথায় ছোটো ছেলে বাবাকে ঘরের বাইরে বের করে দিয়েছে।এই বাসস্ট্যান্ডই এখন তার ঠিকানা। । হাবু জিজ্ঞেস করল, আপনি কিছু খেয়েছেন? বৃদ্ধ বলল, না বাবা খায়নি। রাতে যদি পায়খানা পেচ্ছাব পায় কোথায় যাব?সকালে উঠে কোনো ফ্ল্যাটে গিয়ে অনুরোধ করি যদি দয়া করে কেউ তাদের টয়লেট ব্যবহার করতে দেয়। বুড়ো মানুষ বলে অনেকেই সাহায্য করে।তারপর কিছু খাই। এইভাবেই দিন কাটছে।রাজুর মাথায় হাত, দুনিয়াতে একরকমও হয়।সবাই মিলে বৃদ্ধকে কি করে একটু সাহায্য করতে পারবে এটাই ভাবতে লাগল। এমন সময় বিল্টুই আইডিয়াটা দিল, চল ফেসবুক লাইভ করি। দুদিন আগেই একটা নতুন স্মার্ট ফোন কিনেছি। ওটারও উদ্বোধন হয়ে যাবে।পাবলিককে দেখালে যদি ছেলেগুলোর সুবুদ্ধি ফেরে।পুরোটাই বিল্টু রেকর্ড করল। ধারাবিবরণী দিল রাজু। তারপর পোস্ট।কয়েক মিনিটের মধ্যে লাইক আর কমেন্টে ফেসবুক পেজ ভরে গেল।কেউ লিখেছে খুবই দূর্ভাগ্যজনক, কেউ লিখেছে নতুন প্রজন্ম বৃদ্ধ বাবা মা দের দায়মুক্ত হতে চায়,কেউ লিখেছে এই জন্যই বৃদ্ধাশ্রমগুলোর এত বাড়বাড়ন্ত,একজন লিখেছে ফেসবুকে ছেলেদের ছবি প্রকাশ করা হোক এবং তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হোক।আরও অনেক অনেক কমেন্ট।অনেকক্ষন ফেসবুক লাইভ চলল। ততক্ষনে ক্লান্তিতে বৃদ্ধের চোখ ঘুমে ঢুলে আসছে।চারজনে বৃদ্ধকে নিয়ে কি করবে এই আলোচনা করতে করতে দেখতে পায়নি বাসস্ট্যান্ডে তখন আরেক নতুন যাত্রীর প্রবেশ।রাত তখন প্রায় দুটো। বৃষ্টিটা একটু ধরে এসেছে।এতো রাতে নতুন যাত্রী, তাও আবার বছর তেইশের এক বিবাহিতা মেয়ে, সংগে কেউ নেই।পরনে সালোয়ার কামিজ, শাঁখা সিঁদুর, গলায় একটা সোনার চেন। ব্যাগপত্তর কিছুই নেই।মেয়েটি পুরোটাই ভিজে গেছে।এককোনে ভয়ে জোড়োসডো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এমন যাত্রী দেখলে একটু সন্দেহ হয় বইকি।হাবু সাহস করে এগিয়ে গেল মেয়েটিকে সাহায্য করার জন্য। মেয়েটিকে দেখেই বোঝা যাছ্ছিল কোনো ভালো ঘরের মেয়ে।হাবু জিজ্ঞেস করল, কিছু মনে করবেন না এত রাতে বাসস্ট্যান্ডে একা একজন বিবাহিতা মেয়ে, কারনটা জানতে পারি কি? তাহলে হয়তো কোনো সাহায্য করতে পারব।মেয়েটিকে দেখে মনে হলো মেয়েটি হয়তো কাঁদছিল।চোখের জল বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় কিছু বোঝা যাছ্ছিল না।কোনোক্রমে ভেতরের সব কষ্ট চেপে রেখে মেয়েটি যা বর্ণনা দিল সেটা এইরকম, পাঁচমাস আগে মেয়েটির বিয়ে হয়।ছেলে ব্যাঙ্গালুরু তে চাকরী করে।বিয়ের পর স্ত্রীকে ব্যাঙ্গালুরুতে নিয়ে যাবার জন্য ছেলেটি সব ব্যবস্থা করছিল। এমন সময় বিয়ের একমাসের মধ্যেই ছেলেটির চাকরী চলে যায়। ছেলেটি ব্যাঙ্গালুরুতে থেকেই নতুন চাকরীর চেষ্টা করছিল।তাই বাড়িতে বাবা মা কে কোনো টাকা পাঠাতে পারেনি।সেখান থেকেই ঝামেলার সুত্রপাত।ছেলেটির বাবার একটি ইলেকট্রনিক্সের দোকান আছে। সছ্ছল পরিবার। কিন্তু ছেলের বিয়ে করা বউকে খেতে দেবার পয়সা নেই।তাই অনেকদিন ধরেই শ্বশুর মশাই বাপের বাড়ি চলে যাবার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।বাবা অসুস্থ্য বলে নিতে আসতে পারেননি। মেয়েটিও যেতে চায়নি। বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে কেনই বা যাবে।মেয়েটি তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিল সেই সঙ্গে চেষ্টা করছিল নিজেও যদি কিছু চাকরী করা যায়।কিন্তু সেই সুযোগ আর দিল কই।আজ রাতে একরকম জোর করেই শ্বশুর শাশুড়ি দুজনে মিলে ঘর থেকে বের করে দিল।দুদিন ধরে কিছু খেতেও দেয়নি। শাশুড়ি বলেছে বৌ এর কথায় যখন ছেলে চাকরী ছেড়েছ বৌ কে খাওয়ানোর দায়িত্ব বৌ এর বাপের বাড়ির,তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। তা ছাড়া মেয়েটির বাবা এখোনো পনের পুরো টাকা মেটায়নি।একদিন নতুন বিয়ের পর বর জডিয়ে ধরেছিল। শ্বাশুডি দেখে ফেলে বলেছিল বেশ্যা মেয়ে কোথাকার। যন্ত্রণা আরো অনেক আছে।সেগুলো বলার মতো ক্ষমতা এখন নেই।এখন কোনোরকমে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতে হবে, ওখান থেকে আসানসোলের কোনো ট্রেন ধরতে হবে। আসানসোলে মেয়েটির বাপের বাড়ি ।
সব শুনে চার জনেই নির্বাক।রাজু বিল্টুকে বলল এটাও কি ফেসবুক লাইভ করা উচিত? বিল্টু বলল,জানি না সব উচিত অনুচিত গুলিয়ে যাচ্ছে।






















